March 1, 2011

রোজনামচা - মার্চ ১, ২০১১

ইদানিং জীবন প্রায় গৃহবন্দী, দিনে ঘরেই কাটে বই পড়ে, টিভি দেখে, রাতেও তাই, সাথে থাকে ফাঁকে ফাঁকে ওয়েব ঘাটাঘাটি করা। আজকে এতদিন পরে দু'বেলাই বেরিয়েছিলাম। সকালে মানুষের ভিড়ে রোদের মাঝে তেমন কোন আলাদা অনুভুতি হয়নি। তবে সন্ধের সময়টা ছিলো অন্য রকম, কেমন যেনো ঘোর লাগা।

আজ বিকেলে ছাদে বসে বসে একঝাঁক কিশোর-তরুন দেখেছি , পথে চলতে। ছেলেদের কারো হাতে গীটার, কারো হাতে বইখাতা। কেউ সাইকেলে, কেউ দু'চারজন মিলে হেঁটে চলছে। মেয়েগুলো রিক্সায়, বান্ধবী বা মায়ের সাথে।

বাচ্চাগুলো আমাদের মত খোলা মাঠ পায়নি খেলবার, ওরা খেলছে গলিগুলোতে। হাসিমুখ, দুরন্ত। ওরা জন্মেই দেখেছে খোলা মাঠের অভাব, তাই যা দেখেনি তাই নিয়ে ক্ষেদ নেই কোনো। একচিলতে গলিতেই সুখী ওরা।

সন্ধেয় বেরোলাম গন্তব্যহীন ঘুরতে। পথ সুনশান, ছোটখাটো শহরের সাধারন জীবন, সবাই ঘরে, জমজমাট খালি প্রধান দুটো সড়ক। আমি চলেছিলাম রিক্সা নিয়ে, ঠিক সন্ধে নামার মুখে।

প্রতিটা দৃশ্য যেন দুটো ভাগে আসছিলো, একটা বর্তমান, আরেকটা কম করেও দশ থেকে পনের বছর আগের ছবি।

জেঁকে বসা রাজসিক বাড়ীটার ঠিক পাশেই ছবিটা ভেসে উঠেছিলো গোছালো একটা বড় পুকুরের - পাড় বাঁধানো - একই যায়গার, তাফৎ, সেই বড় পুকুর বুজিয়ে এখন দাঁড়িয়ে আছে এই জাঁকালো ইমারত। একটা বহুতল বাড়ির দিকে চোখ পড়তে ভেসে উঠলো এখানেই ছিলো একটা বহু পুরোনো ডিজাইনের একতলা বাড়ী - প্রায় পরিত্যাক্ত ছাদ, শ্যাওলা আর বটের চারা পুরোনো ইঁটের ফাঁকে ফাঁকে। কাঠের পুল যায়গাটা নামেই এখনো "কাঠের পুল" আছে, সেখানে কবেই কাঠের জীর্ন পুলকে সরিয়ে যায়গা করে নিয়েছে কংক্রীটের মজবুত সাঁকো!

মোড়ের মটরসাইকেলের আলো ঝলমলে শোরুমটার পাশে ভেসে উঠছিলো একসময় ঠিক এইখানেই থাকা সাইবার ক্যাফে আর প্রিন্টের দোকানটা। সামনে পেলাম একটা সুসজ্জিত মসজিদ, কয়েকটা বছর আগেও ছিলো না, ছিলো পুরোনো দালান।

ছোট একটা মেয়েকে নিয়ে মা রিক্সায়, মুখোমুখি পাশ কাটাবে একটু পরেই - দেখে হেসে ফেললাম, মেয়ের মাও হেসে হাত নাড়লো, ইশারা দিলো ফোন করতে। আমার পুরোনো ক্লাসমেট, প্রাইমারী স্কুল আর কলেজে একসাথেই পড়েছি। আমার হাসি আসছিলো অন্য কারনে, ওদের পাশে যে ছবিটা ভেসে উঠেছিলো মনে তাতে আজকের ছোট মেয়েটার মতই দেখাচ্ছিলো মায়ের মা কে, ফ্রক পরা, দুটো ঝুটি বাঁধা চুল। ওর বরকেও চিনি, সহপাঠি আমার ওরা দুজনেই। জানি, ঐ ছেলেটা থাকলে ওকেও হাফপ্যান্ট পরা ঝাঁকড়া চুলো মোটাসোটা বাচ্চাই দেখতাম আজকের চেহারার পাশে।

কাঠগোলার বদলে এখন স্টেশনারীর দোকান আর মুদি খানা - সেই কাঠগোলার পুরোনো যায়গাটাতেই। হোমিও ডাক্তারের চেম্বারটা নেই আর, সেখানে সাইকেল সারাইখানা। ঠিক তিন রাস্তার মাথায় একটা চায়ের দোকান ছিলো, সেটা এখন একটা স্ট্রীট রেস্তোঁরা - ডালপুরি আর মোগলাই ভাজছে।

একটা মাঠ ছিলো একসময়, সেটা এখনো মাঠই আছে, তবে চারপাশে দেওয়াল উঠেছে, একটা বড় লোহার গেইট - যেকোনদিন শুরু হবে কংক্রীটের যজ্ঞ - আরেকটা বহুতল ইমারত আকাশে মাথা তুলবে। রাস্তার পাশগুলো দখল হয়ে গেছে সারিবদ্ধ মুদির দোকানে।

চায়ের দোকানে আগে দেখতাম এক হাতে চায়ের গ্লাস আরেকহাতে সিগ্রেট নিয়ে তর্করত ছোটছোট জটলা - তরুনদের। এখনো বসে, তবে একহাতে প্রায় সবারই মোবাইলে ফেসবুক, একে ওকে দেখনো ফ্রেন্ড লিষ্টের সুন্দরীদের, অথা মজার কোন ফেসবুক ওয়াল স্ট্যাটাস। পার্টি অফিসগুলোর সামনে এখন আর আগের মতন তারুন্যের ভীড় দেখি না, শুধু দেখি কিছু বুড়োটে মানুষ বসা।

দশ-পনেরো বছর আগের জওয়ান পুরুষগুলো কেমন ম্রিয়মান দৃষ্টি নিয়ে চলে, পদক্ষেপ স্লথা, আগের মতন দৃপ্ত নয়। আশেপাশের বাড়ী গুলো আগের মত সরগরম নেই, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে সবাই প্রায় শহর ছেড়েছে ক্যারিয়ার আর নিজেদের নতুন সংসারের জন্য, বাসিন্দা বলতে রিটায়ার্ড বুড়ো-বুড়ি, সন্ধেবেলা ব্যালকনিতে এরওর সাথে কুশল বিনিময়, ডায়বেটিস আর প্রেশারের খোঁজ নেওয়া, রাতে সিরিয়াল দেখে একাকিত্ব ভুলে থাকার দল সব। এরা অপেক্ষা করে উৎসবের - ঈদ আর পুজোতে নিজেদের ছেলেমেয়ারা বেড়াতে আসে, নাতিনাতনিদের নিয়ে সেই দিন ক'টা ভালো কাটে এদের।

সিগ্রেট ছেড়েছি বেশ কিছুদিন হলো, তবে এখন কেনো জানি খুব ইচ্ছে করছে একবুক ধোঁয়া টানতে।

Disqus for Simple thoughts...