May 30, 2011

অবশেষে ধর্মের বানীতেই আদমের পদস্খলন!

শেষমেষ ধর্মের বানীতেই আদমের "প্রথম মানব" পদ নিয়ে শুরু হলো টানাটানি, জানা গেল, আদম প্রথম মানব নন! তার আগেও পৃথিবিতে ছিলো মানুষের বসবাস, আদম আসলে প্রেরিত একলাখ আদমের মাঝে একজন মাত্র!

লেখিকা গবেষনাতে জানিয়েছেন এক লাখের বেশি আদম এই পৃথিবীতে প্রেরীত হয়েছে। ধারনা করছি তার পরবর্তী দাবি হবে এই একলাখ আদম আসলে ক্লোন, তাই মানব ক্লোনিং এর ধারনাও আল-কুরানে আছে।

খবরের সোর্স আদম (আ.) চলতি বলয়ের প্রথম সভ্য মানব : বিলকিস বেগম

খবরটি নীচে হুবহু তুলে দেওয়া হলোঃ


আদম (আ.) চলতি বলয়ের প্রথম সভ্য মানব
বিলকিস বেগম

সাধারণভাবে আদম (আ.)-কে পৃথিবীর আদি মানব বা আল্লাহ সৃষ্ট প্রথম মানব হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, যিনি প্রায় ছয় হাজার বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিলেন। কিন্তু কোরআনুল কারিমের সুরা আল-বাকারায় বর্ণিত ৩০ নম্বর আয়াতে আদম (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, 'নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে খলিফা নিযুক্ত করতে যাচ্ছি।' খলিফা শব্দের অর্থ_'স্থলাভিষিক্ত'। আর 'স্থলাভিষিক্ত' শব্দটি দ্বারা স্পষ্টতই বোঝা যায়, আদম (আ.)-এর আগেও মানুষ ছিল; এবং সংগত কারণেই তিনি স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। আর কোরআনের এই আয়াত আদম (আ.)-কে পৃথিবীর প্রথম মানব হওয়ার দাবিকে সরাসরি খণ্ডন করে।

হাদিস থেকে জানা যায়, আল্লাহ তায়ালা এ যাবৎ এক লাখের বেশি আদম এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। মুসলিম বিশ্বের সুফিকুল শিরোমণি হজরত মুহীউদ্দিন ইবনে আরাবি (রহ.) বলেন, তিনি একবার স্বপ্নে দেখলেন, কাবা শরিফ তাওয়াফ করছেন। স্বপ্নেই এক লোক তাঁর সামনে এসে দেখা দিলেন এবং নিজেকে তাঁর পূর্বপুরুষ হিসেবে পরিচয় দিলেন। ইবনে আরাবি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার মৃত্যু কবে হয়েছিল?' লোকটি উত্তরে বললেন, '৪০ হাজার বছরেরও বেশি হবে আমার মৃত্যু হয়েছে।' ইবনে আরাবি বললেন, 'আদম (আ.) থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত যে সময় অতিবাহিত হয়েছে, এই দীর্ঘ সময় তো তার চেয়েও অনেক বেশি।' তিনি বললেন, 'তুমি কোন আদমের কথা বলছ? তোমাদের সর্বনিকটবর্তী আদমের কথা, না অন্য কোনো আদমের কথা?' ইবনে আরাবি বললেন, 'তখন রাসুল (সা.)-এর (উপরোক্ত) হাদিসটি আমার মনে পড়ে যায়।' (ফুতুহাতে মক্কিয়া, দ্বিতীয় খণ্ড)

কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আদম (আ.) প্রথম নবী এবং তাঁর প্রতি ছোট ১০ খানা কিতাব নাজিল হয়। কিতাব তাঁর ওপরই নাজিল হয়, যাঁর মুখে ভাষা থাকে। ভাষা ছাড়া কিতাব নাজিল অর্থহীন।

আমরা জানি, কোটি কোটি যুগ আগে সৌরমণ্ডল অস্তিত্ব লাভ করেছিল; এবং কোটি কোটি সৌরজগৎ মহাশূন্যে ভেসে চলেছে। আমরা এটাও জানি, আদিম যুগে মানুষ পাহাড়ের গুহায় বসবাস করত। তারা আগুন জ্বালাতে জানত না, কথা বলতে পারত না। অর্থাৎ, তাদের মুখে ভাষা ছিল না। তারা ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলত, গাছের ছাল পরিধান করত, কাঁচা মাংস ও ফলমূল ভক্ষণ করত। তাহলে আমরা কিভাবে বলতে পারি, মাত্র ছয় হাজার বছর আগে যে আদম (আ.) এসেছিলেন, তিনিই সৃষ্টির প্রথম মানব। কোরআনের ৩১ নম্বর আয়াতে 'আসমা' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ_নাম বা গুণ। অনেকে মনে করেন, আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-কে বিভিন্ন বস্তু ও জিনিসের নাম শিখিয়েছিলেন। অর্থাৎ ভাষাতত্ত্ব শিখিয়েছিলেন। নৈতিক গুণাবলি অর্জনের জন্য বেশ কিছু 'আসমা' মানুষের জানা প্রয়োজন। সেসব আসমার কথা কোরআনে উল্লেখ রয়েছে। সব 'আসমা' বা গুণকে একত্রে বলা হয় 'আসমাউল হুসনা'। সুরা সোয়াদের ৭৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'আমি আদমকে আমার দুহাত দিয়ে সৃষ্টি করেছি।' অর্থাৎ আল্লাহর সব গুণ প্রকাশ করার শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সুরা আল-বাকারার ৩০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "আর (স্মরণ করো) তোমার প্রতিপালক যখন ফেরেশতাদের বললেন, 'নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে খলিফা নিযুক্ত করতে যাচ্ছি', তখন তারা বলল, 'তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে নিযুক্ত করবে, যে সেখানে বিশৃৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে'?" ফেরেশতাদের এই প্রশ্ন থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীতে আগেও মানুষ ছিল এবং বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে। তাই আল্লাহর এই সৃষ্টি, অর্থাৎ 'খলিফা' সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে তারা আল্লাহকে এই প্রশ্ন করেছিল। আয়াতটির শেষ দিকে আল্লাহ বলেছেন, 'নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।'

এখানে আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-কে 'খলিফা' হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন; প্রথম মানুষ হিসেবে নয়। এ থেকে বোঝা যায়, আগে পৃথিবীতে যে মানবগোষ্ঠী বসবাস করেছিল, তারা সম্পূর্ণ বিনাশপ্রাপ্ত হয়নি। সম্ভবত তাদের মধ্যে কিছু লোক, অতি হীন অবস্থায় টিকে ছিল, যাদের মধ্যে আদম (আ.)-ও একজন ছিলেন। সেই অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা তাঁকে একটি নতুন মানবগোষ্ঠীর আদিপুরুষ এবং একটি নতুন সভ্যতার পত্তনকারী নবী হিসেবে মনোনীত করলেন। আমরা এর প্রমাণ আরো পাই সুরা আলে ইমরানের ৫৯ নম্বর আয়াতে। ওই আয়াতে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে ঈসা (আ.)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আ.)-এর দৃষ্টান্তের অনুরূপ। তিনি তাঁকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তিনি তাঁকে বললেন, 'হও'; অতএব তা হয়ে যায়।" ঈসা (আ.) এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন, এই পৃথিবীর বুকেই লালিত-পালিত হন এবং অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে নবী হিসেবে প্রেরিত হন। সুতরাং আদম (আ.)-ও এর ব্যতিক্রম নন।

কোরআনের সঠিক ব্যাখ্যার অভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আদম (আ.) সম্পর্কে অনেক ভুল বিশ্বাস রয়েছে। যেমন, অনেকেই মনে করেন, আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সামনে হাজির করলেন এবং তাঁদের আদেশ দিলেন সিজদা করার জন্য। একমাত্র ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করল। সুরা আল-বাকারার ৩৪ নম্বর আয়াতে আরবি 'উস্জুদু' অর্থ_সিজদা করা নয়, আনুগত্য করা। কেননা কোরআনুল কারিম সুনির্দিষ্টভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে (বা অন্য কোনো কিছুকে) সিজদা করতে নিষেধ করে।

সুরা আল-বাকারার ৩৪ নম্বর আয়াতটির অর্থ হচ্ছে, "আর স্মরণ করো, যখন আমি (আল্লাহ) ফেরেশতাদের বলেছিলাম, 'আদমের আনুগত্য করো', তখন ইবলিস ছাড়া সবাই আনুগত্য করল।"

জনসাধারণ্যে এ বিশ্বাসও রয়েছে, আদম (আ.)-কে প্রথমে বেহেশতে রাখা হয়েছিল; এবং সেখানে তিনি শয়তানদের দ্বারা প্রতারিত হন। তাই আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হয়ে বেহেশত থেকে আদম (আ.)-কে বের করে পৃথিবীতে স্থানান্তরিত করেন।
যদি এই বিশ্বাস সঠিক বলে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে বোঝা যায়, বেহেশতে আদম (আ.) ও শয়তান পাশাপাশি অবস্থান করছিল। অথচ আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, বেহেশতে শয়তানের কোনো স্থান নেই। তাহলে শয়তান কিভাবে বেহেশতে প্রবেশ করে আদমকে প্রতারিত করল? আবার আল্লাহ তায়ালা এ কথাও বলেছেন, বেহেশত এমনই এক স্থান, প্রবেশকারী কখনো বিতাড়িত হয় না। তাহলে আদম (আ.) কিভাবে বেহেশত থেকে বিতাড়িত হয়ে পৃথিবীতে এলেন?

সুরা ত্বহার ১১৭ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, 'তখন আমি (আল্লাহ) বললাম, হে আদম! নিশ্চয়ই এই (ইবলিস) হলো তোমার এবং তোমার স্ত্রীর শত্রু। সুতরাং সে যেন এই বাগান থেকে তোমাদের কখনো বের করে না দেয়। তাহলে তুমি দুঃখ-কষ্টে পড়বে।'

বেহেশত এমন এক জায়গা, সেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট কাউকে স্পর্শ করে না। দুঃখ-কষ্ট এই পৃথিবীতেই আছে। সুতরাং এ আয়াত থেকে সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়, আদম (আ.)-কে সৃষ্টির প্রথমেই পৃথিবীতে রাখা হয়েছিল।

আবার ১১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'নিশ্চয়ই তোমার জন্য এটাই নির্ধারিত রয়েছে যে এতে তুমি ক্ষুধার্ত হবে না এবং উলঙ্গও থাকবে না।' ১১৯ নম্বর আয়াতে আরো বলা হয়েছে, 'তুমি সেখানে পিপাসার্ত হবে না এবং রোদেও পুড়বে না।'
উলি্লখিত আয়াত দুটি পৃথিবীতে বসবাস করার জন্য অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য অন্যতম মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও পানীয়ের কথা বলা হয়েছে।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়, আল্লাহ তায়ালা যে স্থানটিতে আদম (আ.)-কে প্রথমে থাকতে আদেশ দিয়েছিলেন, সেই স্থানটি পৃথিবীতেই ছিল, যা ফুলে-ফলে সুশোভিত। সবুজ বনানীর ছায়ামণ্ডিত ছিল, যার দরুন আল্লাহ স্থানটিকে 'জান্নাত' হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সুরা আল-বাকারার ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'তবে তোমরা এ গাছটির কাছে যেও না।' 'শাজারাহ্' অর্থ_গাছ। কোরআনে দুই ধরনের 'শাজারার' কথা উল্লেখ রয়েছে_১. শাজারাহ্ তৈয়্যবাহ (ভালো গাছ), ২. শাজারাহ্ খাবিসাহ্ (মন্দ গাছ)। পবিত্র বস্তু, শিক্ষা ও কর্মকে ভালো গাছের সঙ্গে এবং মন্দ বস্তু, চিন্তা ও কর্মকে মন্দ গাছের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

বস্তুত পৃথিবী ও আকাশে এমন কোনো গাছ নেই, যার ফল খেলে মানুষ উলঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু কোরআনে বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেয়ে আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) উলঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন।

প্রতিটি মানুষেরই কিছু না কিছু দুর্বলতা থাকে। আল্লাহ্র পরীক্ষা এবং প্রচণ্ড চাপে কখনো কখনো সেই দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যায়। তেমনি আদম (আ.)-এর মাঝেও দুর্বলতা ছিল। তাই তিনি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে গেলেন এবং নগ্ন হয়ে গেলেন। এই 'নগ্নতা' আক্ষরিক অর্থে 'নগ্নতা' নয়, এই নগ্নতার অর্থ_আল্লাহর কাছে তিনি লজ্জিত হলেন। অর্থাৎ তিনি নিজ দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত হয়ে লজ্জিত হলেন। এরপর বলা হয়েছে, 'জান্নাতের পাতা' দিয়ে তাঁরা 'নগ্নতা' ঢাকলেন। এই জান্নাতের পাতার অর্থ হচ্ছে_'তাওবা'। অর্থাৎ আদম (আ.) তাঁর দুর্বলতার কথা আল্লাহর কাছে স্বীকার করে তাওবা করলেন। আল্লাহ তাঁর তাওবা কবুল করলেন এবং তাঁকে ফুলে-ফলে সুশোভিত জান্নাতরূপী এই স্থান থেকে বের হয়ে অন্যত্র হিজরত করার এবং সেখানে (অন্যত্র) এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকার আদেশ দিলেন, যাতে তিনি আবারও শয়তানের ধোঁকায় না পড়েন। আধুনিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, জান্নাতরূপী স্থানটি ইরাক বা আসিরিয়ার ব্যাবিলনের 'ইভেন গার্ডেন' বা স্বর্গোদ্যান ছিল। (এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, অধ্যায় : 'উর')
পরে প্রতিবেশী কোনো অঞ্চলে যাওয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ পেয়েছিলেন।

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, আদম (আ.) পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানব নন। তিনি চলতি বলয়ের প্রথম সভ্য মানব, যাঁর মাধ্যমে মানবচক্রের গোড়াপত্তন করা হয়েছে। তাঁর আগেও বহু জাতির উত্থান-পতন হয়েছে। অনেক সভ্যতার আগমন-নির্গমন ঘটেছে। আমাদের পিতৃপুরুষ আদম (আ.)-এর আগে সভ্যতার পত্তনকারী হয়তো অন্যান্য আদমও এসেছিলেন।

লেখক : সেক্রেটারি, তাবলিগ, চট্টগ্রাম। কালেরকন্ঠ মে ৩০, ২০১১

অবশ্য আদমের পক্ষ থেকে বিলকিস বেগমের এই ধর্মীয় গবেষনাপত্রের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো প্রকার সম্মতি বা প্রতিবাদ লিপি পাওয়া যায়নি। (অবশ্য পৃথিবীতে যত ঐশ্বরিক ধর্ম আছে তাদের সকল প্রকার ক্ষমতা আর অভিশাপ কেবলমাত্র মলাটে বাঁধা কিছু রূপকথার বইয়েই সীমাবদ্ধ বলে আদমের পক্ষ থেকে কোনোরকম যোগাযোগ করা হবে এমন ছেলেভুলানো রূপকথাতে আস্থা রাখাও ঠিক হবে না।)



ছবিঃ আদমের স্বর্গচ্যুতি

Disqus for Simple thoughts...