September 21, 2011

সবার ওপরে মোল্লা সত্য, তাহার উপরে নাই! - দাবী করছি সংবিধানে এই লাইনটা জুড়ে দেবার।

মসজিদ কমিটি মিটিং করে একজন মানুষকে দোররা মেরে বা ইঞ্জেকশন দিয়ে মেরে ফেলার ফতোয়া জারি করে - এ কোন দেশ! এই মৃত্যুদন্ড ঘোষনা দেবার ক্ষমতা মোল্লাদের কে দেয়! প্রাপ্তবয়ষ্ক একটা মানুষের কি অধিকার নেই নিজের ইচ্ছে মতন জীবনসংগী বেছে নেবার, বিয়ে করার?  নীচের সংবাদ পড়ুন, নিজেই ভাবুন





মধ্যযুগের অবসান হয়েছে বহু আগে, অন্তঃপুর ছিল যাদের বিচরণক্ষেত্র সেই নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্র আজ প্রসারিত হয়েছে আরো, নারীর কর্মমুখরতা আর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন যখন আগের চেয়ে বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে এবং গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে বেশি করে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকাসহ শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীদের, দেশের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া ছাত্রীদের উপর নিপীড়নের কষ্টগাঁথা নারী মুক্তির পথে আমাদের সকল অগ্রযাত্রাকে ম্লান করে দেয়। নিজের অগ্রযাত্রার পথে পরিবার ও সমাজের গোঁড়ামিকে দাঁড়াতে দেখা ও তাদের হাতে অত্যাচারিত হওয়া তেমনি এক নারী আরেফা পারভিন। ‘মেয়ে মানুষ ঘরে থাকবে, তাদের পড়াশোনা ও চাকরি-বাকরির দরকার নেই’ এ ধরনের মানসিকতা সম্পন্ন পরিবারের সমাজের শৃংখল ভেঙ্গে আরেফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে ২০০৭ সালে মাস্টার্স পাস করে এবং পরিবারের কথা অমান্য করে পড়াশোনা শেষে ঘর নামক খাঁচায় ফিরে না গিয়ে আরেফা চাকরি শুরু করেন ২০১০ সালে জুন-এর দিকে ‘আকসা ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে’ পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসাবে। অথচ সেই ঈদে বাড়ি যাবার পর পরিবারের চাপে আর ফিরতে পারে না ঢাকায় এবং এর ফলে সে তার চাকরি হারায়।

কিন্তু নাছোড়বান্দা স্বাধীনচেতা আরেফা অনেক কষ্টে পঞ্চগড় থেকে ঢাকায় আসে একটা চাকরি যোগাড় করে স্বাধীনভাবে থাকবে এবং নিজের পছন্দের কাউকে বিয়ে করবে বলে। তাই ২০১১ সালের জানুয়ারীতে জায়ান্ট গ্রুপের গ্লোবাল সাপ্লাই লিমিটেড এ তার বন্ধুদের সাহায্যে একটা চাকরি খুঁজে নেয়। সেখানে থাকা অবস্থায় তার মায়ের চাপা-চাপিতে গত মার্চ মাসে সে বাড়ি যায়, কিন্তু সেই বার পঞ্চগড় গেলে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আবারো তাকে আটকে রাখা হয়। ফলে আবারো চাকরির পথে বাঁধা আসে যদিও বাড়ি থেকে এসে অফিসে অনুরোধ করে বহুকষ্টে চাকরি বজায় রাখে সে এবং এ বছর ঈদে বাড়ি যেতে অসম্মতি জানায়, পরিবারকে জানিয়ে দেয় সে এখানেই স্বাধীনভাবে থাকতে চায়। ইতিমধ্যেই স্বাধীন মানুষের মতো নিজের পছন্দের এক ছেলেকে বিয়ে করে সে। পরিবার থেকে তখন তেমন কিছু না বললেও ঈদের দুই দিন পর অর্থাত্ এই মাসের ৪ তারিখে তার ভাই তার হোস্টেলে এসে সকাল নয়টায় নাস্তা খাওয়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তাকে মাইক্রোবাসে করে পঞ্চগড়ের বাসায় নিয়ে যায়।

এরপর তাকে পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করা নিয়ে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা শুরু করে। তার আইনত স্বামীকে আরেফা জানায়, সে জানতে পেরেছে অন্য ধর্মের ছেলেকে বিয়ে করায় সেই এলাকার মসজিদ কমিটি মিটিং করে আরেফাকে দোররা মেরে বা ইঞ্জেকশন দিয়ে মেরে ফেলার কথা বলছে। স্বামী রঞ্জন আরেফার ভাই ও আত্মীয়দের সাথে কথা বলে তাকে আনার চেষ্টা করেও পারেনি, স্ত্রীর সাথে দেখাই করতে পারেনি সে। প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারীকে উদ্ধার করে আনার কাজে সে স্থানীয় পুলিশ, সাংবাদিক বা মানবাধিকার কর্মী কারোরই সাহায্য পায়নি সে। আরেফার দুর্দশার কথা আজ লিখছি, কিন্তু সমাজের নিষ্ঠুরতা, পরিবারের অমানবিকতা আমাদের নির্বিকারত্ব ও গোঁড়ামির প্রতি অসহায়ত্ব যদি ওই স্বাধীনচেতা মেয়েটিকে মানুষের মত মুক্তভাবে বাঁচতে না দেয় সে খবর এই হাতে কি করে লিখব? মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অমর শব্দগুচ্ছ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এ অমর বাণী কি আজকের আধুনিক যুগে মিথ্যে হয়ে যাবে?
লীনা রহমান, ইত্তেফাক, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১১

এবারে নিজেকেই প্রশ্ন করুন, সবার ওপরে মোল্লা সত্য, তাহার উপরে নাই! -  সংবিধানে এই লাইনটা জুড়ে দেবার দাবীটা খুব একটা অন্যায় কি না।

Disqus for Simple thoughts...