January 22, 2012

শিরোনামহীন –১২ …

১৯৯৮...
রাত দশটা। মফস্বলে রাত দশটা মানে অনেক রাত। রাস্তা সুনসান। স্ট্রীট লাইটের আলোতে সরছে না রাস্তার বুকে জমে থাকা অন্ধকার,  কেমন যেনো দলা পাঁকিয়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। মোড়গুলোতে দলা পাকিয়ে জাঁকিয়ে বসে অন্ধকারের দলা। রিকশা টুংটাং আওয়াজে ধীর গতিতে চলছে রাস্তা দিয়ে। কেউ আসছে। আর সেই রিকশাটার অপেক্ষায় এক মোড়ের কাছে অন্ধকারের পেটে অধীর বসে কয়েকজন লোক, লুঙ্গী পরা, চাদরে মোড়া মুখ-মাথা। 


রিকশাটা এগিয়ে আসতে থাকে কাছে, টুংটাং শব্দের এগিয়ে আসা থেকে বোঝা যায়। কাছাকাছি হতেই নেতাগোছের একজন রাস্তার ওপরে দাঁড়ায় এসে, রিকশার পথ আটকে। পিছু নেয় তার সাথীরা।
মুহুর্মুহু কয়েকটি গুলির আওয়াজ, এরপরে একটা বোমা চার্জের শব্দ - এরপরই ঝেড়ে দৌড় দেয় ওরা। অপারেশন শেষ, টার্গেট মরলো নাকি বাঁচলো সেটা দেখবার আদেশ নেই, বরং নির্দেশ আছে ম্যাগজিন শেষ করে বোমা চার্জ করে ছুট লাগাতে। অবশ্য টার্গেট লোকটার বাঁচবার প্রশ্নই ওঠে না। গুলিতে কোনোভাবে বেঁচে গেলেও বোমাটা যথেষ্ট শক্তিশালী - টার্গেট বাঁচবে না কোনো ভাবেই। 

পেছনে পড়ে থাকে বছর চল্লিশ বয়সী একটা ভারী গড়নের পুরুষের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ, শরীর ক্ষতবিক্ষত হলেও মুখটা আশ্চর্য্য ভাবে অক্ষত আছে, বড়বড় দুটো চোখ, পুরুষালী মোটা গোঁফ।

২০০৭...
ভর দুপুর। মফস্বলে এসময় মানুষ হয় পেটপুরে ভাত খেয়ে ভাত খেয়ে বিছানা অথবা কোনো কোনা খুঁজে নিয়ে ভাতঘুম দেয়, নইলে ঝিম টেনে টিভি খুলে বসে। 


লিকলিকে কালো একটা লোক, মারাত্মক শুকনো শরীর, তবে ক্ষিপ্র আর চটপটে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কার্নিশ বেয়ে উঠে পড়ে দোতলার ঝুল বারান্দায়। লিকলিকে শুকনো শরীর নিয়ে সহজেই ঢুকে পড়ে মোটা ফাঁকের শিক গলে। 

ঢুকে চট করে এদিক ওদিক তাকিয়ে নেয়। তারপর আনমনে মুচকি হেসে ওঠে। শিকারকে এমন সহজে বাগে পাবে কল্পনাও করেনি লিকলিকে কালো শিড়িঙে লোকটা। তার শিকার তখন এটাচড বাথরুমে, বেসিনে মুখ নীচু করে মুখে পানির ঝাপটা মারছে। 

পা টিপে হাঁটা লোকটার অনেক বিশেষত্বের একটা, এই প্রফেশনে আসলে অনেক কিছু আয়ত্ব করতে হয় প্রানের দায়ে। পা টিপে টিপে ঠিক বাথরুমের দরজার চৌকাঠে পা রাখে খুনী। তারপর পিস্তলটা বাগিয়ে আরেকটু এগোয়। 

মাথার পেছনে খোঁচা লাগা জিনিষটা কি সেটা বোঝার আগেই ট্রিগার ছোটে, পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জ থেকে বুলেট মাথার একপাশ চুরমার করে দেয়। লাশটা পড়ার আগেই ধরে ফেলে খুনি, আস্তে করে শুইয়ে দেয় লাশটা বেসিনের নীচে। তারপর ছিটকে আসা রক্ত ধুয়ে ফেলে। ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে আসে, আবারো সেই সার্কাসের প্রাকটিস - শিক গলিয়ে শরীর বের করে তারপর কর্নিশ বেয়ে নেমে আসা। এরপর আর পেছনে তাকায়নি খুনি, সেরকমই "ইন্সট্রাকশন" ছিলো, সোজা হেঁটে ওঠে গলির প্যাঁচগোচের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ীতে।
লাশ, বয়স একুশ, লম্বা স্বাস্থ্যবান শরীর, বড় বড় চোখ, ঠোঁটের ওপরে পাতলা একটুকরো গোঁফ আছে।

২০**...
সাইলেন্ট করে রাখা মোবাইলটা বেজে ওঠে, কানে ঠেকিয়ে রিসিভ বটনে চাপ দিতে ভারী গলায় "গলিতে ঢুকছে" বলেই কেটে যায় কলটা। লোকটা ফোন নামিয়ে পিস্তলের বাঁট শক্ত করে চেপে ধরে। লোকটা জানে, আর মিনিট তিন-চারেকেই এসে যাবে সাইকেল আরোহী - তার টার্গেট। লুঙ্গী কাছা মেরে চাদর দিয়ে মাথা-মুখ আবারো ঢেকে নেয়, যদিও জানে, রাত এগারোটায় এই সুনসান গলিতে বোমা ফাটলেও কমপক্ষে দশমিনিটের আগে কেউ আসবে না, পুলিশ আসতে কমসে কম ঘন্টা লাগবে। 


মাথা জোরে ঝাঁকি দেয় লোকটা, আবারো মনে করে নেয় "নির্দেশ" - "পিস্তলের ম্যাগজিন খালি করে ফেলতে হবে টার্গেটের ওপর, তারপর বোমা চার্জ এবং উল্টো ঘুরে দৌড় - গাড়ী অপেক্ষা করবে।" - একটু মুচকি হাসি জমা হয় ঠোঁটের নীচে, এই নিয়ে ওদের তিনটেকে খতম করা হবে, দুবার একই স্টাইলে। মাথার ভেতর অস্পষ্ট ভেষে ওঠে ব্রিফিং এর একটা লাইন "টার্গেট ওর পরিবারের অন্যদের চাইতে আলাদা, নি:শব্দ আর ক্ষিপ্র, কৌশলীও।" এবারে বিদ্রুপের হাসি ভাসে খুনির মুখে, টার্গেট সোজা সাইকেল চালিয়ে আসছে, আবছা আঁধারে দেখা যাচ্ছে - একদম ওর কোলের ভেতর এসে পড়বে একটু পরেই।
সাইকেল আরোহী মধ্যম গড়নের, বয়স একত্রিশ, হাইট পাঁচফুট ছয়, বড় বড় চোখ, নাকের নীচে মাঝারি গোঁফ। সাইকেলে বসে গুন গুন করে সুর ভাঁজে আরোহী - একটু পরেই পৌঁছুবে ঘরে। 

মোড়ের কিছু আগে ওৎ পেতে বসে থাকে শিকারী। শরীর শক্ত হয় খুনের নেশায়। এবারে বের হবার প্রস্তুতি নেয় খুনী। 

টাশ টাশ করে একটানা অনেকগুলো আওয়াজ।
একটা জোরালো বিষ্ফোরন। 


শিকারী নিজেই শিকার হিসেবে ছিন্নভিন্ন শরীরে পড়ে আছে মাটিতে। 

ওৎপেতে থাকা ষন্ডা চেহারার লোকগুলো আড়াল ছেড়ে বেরোয়, সবারই হাতে অস্ত্র, একজনের হাতে টু ওয়ে রেডিও। 

সাইকেলটা এসে দাঁড়ায়।

খানিক কথা বিনিময় শেষে সাইকেলটা আবার টুংটাং শব্দে চালিয়ে নিয়ে ঘরমুখো হয় মানুষটা। সাইকেল আরোহী মধ্যম গড়নের, বয়স একত্রিশ, হাইট পাঁচফুট ছয়, বড় বড় চোখ, নাকের নীচে মাঝারি গোঁফ। 


 
(শিরোনামহীন সিরিজটার নাম আসলে নিজের অদক্ষতাকে ঢাকতে, গল্পের টাইটেল ঠিক করতে হিমসিম খাওয়া এড়াতেই আরকি। যতদূর মনে পড়ে খান দশ/এগারো লেখা দিলো এই টাইটেলে, শুরু ছিলো "শিরোনামহীন - শূন্য" থেকে। তারপর অনেকগুলোই পরে ড্রাফ্ট করে ফেলি সামহ্যোয়ারইন এবং নিজের অন্যান্য অনলাইন ব্লগে। আজকে আবার টেষ্ট ড্রাইভ দিলাম।

এই লেখাটা আসলে আমার চারটে কুড়িয়ে পাওয়া বোনের একটা, পুতুলকে ওর জন্মদিনের উপহার হিসেবে দিলাম)

Disqus for Simple thoughts...