February 10, 2013

জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে সসম্মানে সমাহিত আছেন একজন প্রথিতযশা যুদ্ধাপরাধী খান এ. সবুর

 

রাজধানীর ব্যস্ততম ধানমন্ডি-মিরপুর সড়কের মানিক-মিয়া জংশন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ভবন,ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্র এবং আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ধারক ও বাহক "জাতীয় সংসদ" থেকে মাত্র অল্প কিছু দূরে সাজানো,ছিমছাম কিছু সমাধিসৌধ।নিয়মিত পরিচর্যা করা হয় আমাদের জনগণের অর্থায়নে সংসদ ভবনের কর্মচারীদের মাধ্যমে। অনেক দিন থেকেই চোখে পড়ছিল।


ঢাকায় যেখানে মৃত্যুর আগে নাকি কবরের জায়গা বুকিং দিতে হয় সেখানে নগরীর একদম প্রাণকেন্দ্রে সংসদ ভবনের নিজের জমিতে এই ধরনের সমাধিসৌধ স্বাভাবিকভাবেই ধারণা দেয় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোন ব্যক্তির কবর হিসেবে। কিন্তু হঠাৎ দুঃস্বপ্নের মত একটি তথ্য বদলে দেয় সেই ধারণাটি।একটি কবরের উপর নামফলকে লেখা,"খান এ. সবুর"। নামটা কেন যেন চেনা চেনা লাগে। কে এই খান এ. সবুর?


=>September 7, 1971 : ঢাকায় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মুসলিম লীগ নেতা খান এ. সবুর বলেন, “পাক-ভারত যুদ্ধ বাধলে তা বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেবে। ভারত পাকিস্তানের দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করতে পারবে না বলেই পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিবাহিনীর নামে পঞ্চম বাহিনী গড়ে তুলেছে। মুক্তিবাহিনী কাদের বিরুদ্ধে লড়ছে? দেশতো মুক্ত।“


=>May 2, 1971 : শান্তি কমিটির উদ্যোগে খুলনায় এক সভায় সবুর খান বলেন, কতিপয় ব্যক্তি ব্যতীত 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ' পাকিস্তানিরা প্রত্যাখ্যান করেছে। এটা কোনো মতবাদই নয়। বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছে। পাকিস্তানকে আমরা ধ্বংস হতে দিতে পারি না। আমরা সবাই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের পক্ষে। জীবন দিয়ে হলেও আমরা পাকিস্তানকে রক্ষা করবো।


=>October 6, 1971 : খান আবদুস সবুর খানের বাসায় কাইয়ুম মুসলিম লীগের কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে মুসলিম লীগ (কাইয়ুম) প্রধান কাইয়ুম খান বলেন, 'রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় প্ররোচনায় ইসলামের বদলে ভাষাকেই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি বলে প্রচার শুরু করা হয়। ভাষাভিত্তিক শ্লোগানের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো পাকিস্তানের ধ্বংস করা।'
=>June 7, 1971 : মুসলিম লীগ নেতা খান এ. সবুর ঢাকায় এক বিবৃতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুরুর আগে পাকিস্তানি পতাকা ও সঙ্গীত পরিবেশনের দাবি করেন।


=>May 21, 1971 : খুলনায় প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী খান এ.সবুর, প্রাক্তন প্রাদেশিক মন্ত্রী এস.এম. আমজাদ হোসেন ও প্রাক্তন জাতীয় পরিষদ সদস্য এ.কে.এম. ইউসুফ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, আমাদের সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগের জাতীয় সংহতি বিরোধী কার্যকলাপ ব্যর্থ করে দিয়েছে। আমরা রাষ্ট্রদ্রোহীদের নির্মূলের কাজে নিয়োজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য প্রদেশের জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানাই।


শুধু তাই নয় ১৯৬৪ সালে তার প্রত্যক্ষ মদদে খুলনাতে এক রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয় যার সুবাদে এই খান আবদুর সবুর রুপচাঁদ বিশ্বাসের ত্রিশ বিঘা জমি দখল করে নেয় আদালতের আদেশ অগ্রাহ্য করে।


মনে প্রাণে চাইছিলাম,যা ভাবছিলাম তা যেন সত্যি না হয়। যেই সংসদের উপর পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এই মাটির তরে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল আমাদের শত,সহস্ত্র বাঙ্গালী সেই সংসদের মাটিতেই আজ শুয়ে আছে একজন দেশদ্রোহী রাজাকার।এই রাজাকারের নামে স্কুল,কলেজ হয়,স্মৃতি সংঘ হয়,দখল করা সম্পত্তিগুলোই জনস্বার্থ দান করে সে দানশীল স্বীকৃতি অর্জন করেন, তার মৃত্যুর দিন শোকসভার আয়োজন হয়,গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয় কিন্তু আমাদের বীরশ্রেষ্ঠদের শাহাদাত বার্ষিকীতেই এই গণমাধ্যমগুলো থাকে নিশ্চুপ।


আমাদের বীরশ্রেষ্ঠদের কবর পড়ে থাকে পাকিস্তানে,ভারতে,দেশের ভেতরে,অনাদরে,অবহেলায়,অযত্নে।দেশের মাটির জন্য অপেক্ষা করতে হয় তাদের বহু দশক। "গাদ্দার" লেখা নিয়ে আমাদের মতিউরের এপিটাফ যখন নিঃসঙ্গ,পরাজিত এবং রণ ক্লান্ত যোদ্ধার মত দাঁড়িয়ে ছিল পাকিস্তানে;ঠিক তখনই আমরা নিজেদের গাদ্দারকে সমাহিত করেছিলাম রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আমাদের জাতীয় সংসদের মাটিতে। এই পিশাচগুলোই এক সময় পাকিস্তানী বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিল আমাদের উপর। কী বিচিত্র এক জাতি আমরা!আমাদের পূর্বপুরুষদের হত্যাকারীদের আমরা জায়গা দিচ্ছি দেশের পবিত্রতম স্থানগুলোতে। এই কবরটি আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতা বিরোধীরা আজ আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কত কাছাকাছি।


করাচী,ত্রিপুরা থেকে ঢাকা কতদূর জানিনা,জানিনা সেদিন মতিউর আর হামিদুরের আত্মার করুণ আর্তনাদ বাংলার আকাশে শোনা গিয়েছিল কিনা।শুধু এটুকু বলতে পারি সংসদ ভবনের সামনের সেই রাস্তা দিয়ে যাবার সময় শ্রদ্ধাভরে লুই কানের সেই অসাধারণ স্থাপত্যটির দিকে মাথা উঁচু করে আর তাকানো হবে না।


তথ্য এবং ছবি কৃতজ্ঞতা: মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোন A Page totally based on liberation war'71

Disqus for Simple thoughts...