শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-১৭)(শেষ পর্ব)
আজকের পর্বের মাধ্যমে শেষ করছি ১৭ পর্বের এই অনুবাদ। এই অনুবাদগুলোতে আমি চেষ্টা করেছি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত ঘৃণ্য অপকর্মগুলোর অংশবিশেষ তুলে ধরতে। এই লেখাগুলোর কোন অংশ আমার নিজের লেখা নয়, একটি ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া লেখার বাংলা অনুবাদ করেছি মাত্র। ঘৃণ্য এইসব নরকের কীটদের অপকর্মের শেষ নেই, সেগুলো সব আমার একার পক্ষে তুলে ধরা সম্ভব নয়। কিছু অংশের অনুবাদ করে ব্লগারদের জানানোর জন্য ব্লগে তুলে ধরলাম। আশা করি যুদ্ধাপরাধীদের নানা অপকর্মের কিছু অংশ হলেও আমার এই পোষ্টগুলো থেকে ব্লগাররা জানতে পারবেন।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (বাকী অংশঃ)

গাউস যা বলেছেন আবদুস সালাম তার পুনরুল্লেখ করেছেন। সালাম মুজাহিদকে জামাতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এই পদের কারণে তার কর্মকান্ডসমূহ সমগ্র ঢাকাশহর ব্যাপী বিস্তৃত ছিল। সালাম বলেন, “আমি ফিরোজের বাড়ী থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও ছবি উদ্ধার করি। এই প্রমাণগুলোর মধ্যে ছিল ঢাকায় কাজ করা রাজাকারবাহিনীর তালিকা। তাদের বিভিন্ন কাজের ছবি ও তাদের জীবন বৃত্তান্তও ছিলো প্রমাণের মধ্যে। পরে আমার বাসায় পুলিশি হামলার পর প্রমাণগুলো হারিয়ে যায়। যুদ্ধের পর ফিরোজের বাড়ীটি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হতো।”
কলামিস্ট মাহবুব কামাল ফিরোজের বাড়ীটিকে ভূ-গর্ভস্থ একটি কারাকক্ষ ও ষড়যন্ত্রের স্থল হিসেবে বর্ণনা করেন। রাজাকারদের সশ্রস্ত সন্ত্রাসীরা এই বাড়ী থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ীতে হামলা করতো। তিনি বলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জোবেদ আলীর বাসায় কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছিল। “তারা আমার এক বন্ধ নাজু’র বাসায়ও কয়েকবার তল্লাশী চালায়, ’৭১ এর আগষ্ট থেকে নাজুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। আমরা বিশ্বাস করলাম যে নাজু নিশ্চয়ই ফিরোজ ও তার দোসরদের হাতে নিহত হয়েছে।” কামাল আরো বললেন যে, ’৭১ সালে তাঁর এক চাচাতো ভাই চাকুরী খুঁজতে এসে তার বাসায় থাকতো। মহসিন নামের তার সেই চাচাতো ভাই নামাজ পড়ার জন্য স্থানীয় মসজিদে যেতো, সেখানে মুজাহিদ তাকে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য বলে। পরে কামালের পরিবার মহসিনকে মুজাহিদের দল থেকে বাঁচানোর জন্য তাকে গ্রামে ফেরত পাঠাতে হয়েছিল।
ফকিরারপুল শহরতলির স্থানীয়দের মতে, ফিরোজ ৩০০যুবকদের সমন্বয়ে রাজাকারবাহিনী গঠন করে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনকারী সাধারণ লোকদের হত্যা ও নির্যাতনের জন্য তাদের নিয়োগ করে। স্থানীয়রা আরো জানায় যে, ফিরোজের বাড়ীতে মহিলাদের নির্যাতন করা হতো। একজন শীর্ষস্থানীয় ফুটবল খেলোয়ার, যাকে ফিরোজের লোকেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তিনি বলেন, তাকে সেই বাড়ীতে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। তিনি আরো জানান, তিনি ফিরোজের বাহিনী দ্বারা দিনে-রাতে বহু যুবমহিলাকে ধর্ষিত হতে দেখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর কয়েকবছর আত্নগোপনে থাকার পর, অন্যান্য রাজাকার সহযোগীদের মতো মুজাহিদ আবার ফিরে আসে এবং ১৯৭১ সালের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে শুরু করে।১৯৭৮ সালের সাপ্তাহিক বিচিত্রার একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, মুজাহিদ আবদুস সোবহান নামের একজন প্রতিপক্ষের ছাত্রনেতাকে হত্যায় নেতৃত্ব দেয়। কয়েকবছর আগে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে রাজত্ব করা বাংলা ভাই এর বাহিনী সৃষ্টিতে মুজাহিদ অন্যতম শীর্ষ ভূমিকা পালন করেছিল বলে যে কেউ বাজী ধরতে পারে।
সূত্র
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-১৬)
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদঃ

বিগত জোট সরকারের আমলে টেকনোক্র্যাট কোটায় সমাজকল্যাল মন্ত্রী মুজহিদ ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ও ঢাকায় আল-বদর বাহিনীর প্রধান ছিল। দলের প্রতি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন নির্বিচারে হত্যাকান্ড, লুটপাট, মহিলাদের নিগৃহিত ও ধর্ষণে মুজাহিদ সহায়তা করেছিল। বিজয়ের প্রাক্কালে বুদ্ধিজীবি হত্যায় সে নেতৃত্ব দিয়েছিল।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিবৃতি থেকে তার স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকান্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর ফরিদপুরে ইসলামী ছাত্রসংঘের একটি সমাবেশে বক্তৃতাকালে সে ঘোষণা করে যে, ভারতের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার আগে তাদের আসাম(সিলেট সীমান্তে একটি ভারতীয় রাজ্য) দখল করে ফেলা উচিৎ ছিল। সে তার সশ্রস্ত সন্ত্রাসীদের এই কাজে প্রস্তুত হওয়ার জন্য আহবান জানায়। ১৫ই অক্টোবর প্রকাশিত একটি রিপোর্টে মুজাহিদকে উদৃত করে বলা হয়, রাজাকার ও আল-বদর সম্বন্ধে প্রশ্নবিদ্ধ মন্তব্য করার জন্য সে ভূট্টো, কাওসার নিয়াজী ও মুফতি মাহমুদের সমালোচনা করেছিল। “রাজাকার ও আল-বদরের যুবকেরা এবং অন্যান্য সকল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জাতীয় স্বার্থে ভারতের দালাল ও তার সহযোগিদের হাত থেকে জাতিকে রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি এটি দেখা গেছে যে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা যেমন জুলফিকার আলী ভূট্টো, কাওসার নিয়াজী, মুফতি মাহমুদ ও আসগর খান এইসব দেশপ্রেমীদের বিরুদ্ধে প্রশ্নবিদ্ধ মন্তব্য করে আসছে।”
মুজাহিদ এই শ্রেণীর নেতাদের কর্মকান্ড বন্ধ করতে সরকারকে আহবান জানায়। এবং একই সাথে সে ছাত্রদেরকে তাদের পড়াশুনায় ফিরে যেতে এবং স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার আহবান জানায়।
২৫শে অক্টোবর আরেকটি বিবৃতিতে মুজাহিদ ১৭ই রমজানকে বদর দিবস হিসেবে পালনের আহবান জানায় এবং বলে, “এখন আমরা ইসলাম বিরোধী শক্তির মোকাবেলা করছি। আমরা আজ জাতির স্বার্থে দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার শপথ নেবো।”
যুদ্ধের দিনগুলোতে মুজাহিদ ঢাকার ফকিরারপুল ও নয়াপল্টনের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতো। তবে সে বিশেষ করে ১৮১, ফকিরারপুলের জনৈক ফিরোজ মিয়ার বাসায় বসবাস করতো। জাতীয় পার্টি নেতা আবদুস সালাম, সাংবাদিক জিএম গাউস, মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট মাহবুব কামালের সাক্ষ্যমতে এই ফিরোজ রাজাকার বাহিনীর একজন কমান্ডার ছিল।
ফিরোজের বাড়ীটি স্থানীয় রাজাকারদের সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, এখানে তারা গোপন বৈঠকে বসে তাদের কর্মপন্থা ঠিক করতো। এই বাড়ীতে বিভিন্নরকম কাজের সুবিধা ছিলঃ স্থানীয় সদরদপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও নির্যাতন কক্ষ। স্থানীয় লোকদের মতে, বহু লোকদের ঐ বাড়ীতে চোখ বাঁধা অবস্থায় ধরে নিয়ে যাওয়া হতো এবং ঐ বাড়ী থেকে নির্যাতনের আর্তনাদ শোনা যেত। মুজাহিদ ছিল পালের গোদা।
সাংবাদিক জিএম গাউস বলেছেন, তিনি মুজাহিদকে একটি ইসলামিক সংগঠনের নেতা হিসেবে জানতেন। সে ফকিরাপুল এলাকার একজন ভাড়াটে ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের বহু আগে থেকে তার সংগঠনে স্থানীয় ছাত্রদের সংগ্রহে জড়িত ছিল। যুদ্ধ ঘোষণার সাথে সাথে সে রাজাকার বাহিনীর একটি বিশাল দল গঠন করে, যারা শুধুমাত্র তার কাছে জবাবদিহি করতো। তারপর মুজাহিদ ফিরোজ মিয়াকে তার নবগঠিত বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ করে এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করতো। সংগঠনটির অস্ত্রভান্ডার ও তহবিলের জন্য মুজাহিদ ছিল একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সেপ্টেম্বরের পর থেকে, যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরাজয় শুরু হল, মুজাহিদ সাধারণ স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালী হত্যা কৌশল পরিবর্তন করে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবি ও পেশাজীবি হত্যা কৌশল অবলম্বন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে চিহ্নিত শিক্ষাবিদদের হত্যার পেছনে মুজাহিদ ছিল অন্যতম নেতা।
...........................(চলবে)
সূত্র
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-১৫)
মোহাম্মদ কামারুজ্জামান (বাকী অংশঃ)

৪. তাপস সাহা কমিশনকে জানায় যে, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে, শেরপুর কলেজের ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ আবদুল হান্নানকে সম্পূর্ণ দিগম্বর অবস্থায় এবং মুন্ডিত মস্তক ও গলায় জুতার মালা পরিহিত অবস্থায় শহরের সড়কজুড়ে প্রদক্ষিণ করানো হয়। কামারুজ্জামান এবং তার দল অধ্যাপককে দুপুরবেলা সমগ্র শহরজুড়ে টেনে নিয়ে যায় এবং তাকে টেনেহিঁচড়ে নেয়ার সময় চামড়ার বেল্ট দিয়ে প্রহার করা হয়।
৫. আওয়ামী লীগ এর প্রাক্তন নেতা জিয়াউল হক বলেন, ২২শে আগষ্ট বিকেল ৫টার দিকে আল-বদরের তিনজন লোক তাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাকে একটি ক্যাম্পের অন্ধকারাচ্ছন্ন গর্তের ভেতর দু্ইদিন ফেলে রাখা হয়। তিনি বলেন, কামারুজ্জামান নির্যাতন কেন্দ্রটি চালাতো। এলাকাটি ছেড়ে চলে যেতে বলার পর তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়, সাথে সাথে তাঁকে এটিও বলা হয় যে, এলাকা ছেড়ে না গেলে তাঁকে হত্যা করা হবে।
৬. প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও বর্তমানে জাতীয় পার্টির নেতা এমদাদুল হক হীরা বলেন, কামারুজ্জামানের নির্দেশে পাকিস্তানী সৈন্যরা তার ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তিনি কমিশনে উল্লেখ করেন যে, সৈন্যরা তাঁর ঘরের আঙ্গিনার সামনে পাঁচটি বাঙ্কার স্থাপন করেছিল এবং বন্দীদের হত্যা করার পূর্বে তার আঙ্গিনার সামনে তাদেরকে একটি বড় গাছের সাধে বেঁধে ফেলতো।
৭. শেরপুরের জয় মামুদ কলেজের একজন বর্তমান শিক্ষক এবং প্রত্যক্ষদর্শী মুশফিকুজ্জামান বলেন, মধ্য আগষ্টে কামারুজ্জামানের উপস্থিতি ও নেতৃত্বে তিন আনি বাজার এলাকার ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়।
৮. বন্দীদের এবং মৃতদেহ বহনকারী ট্রাকের চালক হিসেবে কাজ করা একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, কামারুজ্জামান একজন মুক্তিযোদ্ধার ঘর জ্বালিয়ে দিতে পাকিস্তানী সেনাদলকে নির্দেশনা দিয়েছিল।
কামারুজ্জামান ঐ এলাকায় ডাকাতদলের নেতৃত্ব দিয়েছিল বলেও অভিযোগ আছে।
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-১৪)
মোহাম্মদ কামারুজ্জামানঃ

মোঃ কামারুজ্জামান ছিল জামায়াতী মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক এবং বর্তমানে সে সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক। ১৯৭১ সালে কামারুজ্জামান ময়মনসিংহে ইসলামী ছাত্র সংঘ (মুসলমান ছাত্রদের সংগঠন)-এর নেতা ছিল। সে আল-বদর বাহিনীরও প্রধান উদ্দ্যেক্তা ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ই আগষ্ট দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়, “পাকিস্তানের ২৫তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের জন্য আল-বদর বাহিনী দ্বারা ময়মনসিংহে একটি রেলী ও আলোচনাসভা আয়োজিত হয়। আল-বদর এর প্রধান উদ্দ্যেক্তা মোঃ কামারুজ্জামান স্থানীয় মুসলিম ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করে।”
কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধসমূহঃ
১. শেরপুর এলাকার একজন শহীদের পিতা ফজলুল হকের মতে, কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে ১১সদস্যের আল-বদর বাহিনী ১৯৭১ সালের জুন বা জুলাই এর দিকে তার সন্তান বদিউজ্জামানকে ধরে নিয়ে যায়। ফজলুল হক বলেন তার ছেলেকে নিকটবর্তী আহমেদনগর এর পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর শহীদ বদিউজ্জামানের ভাই হাসানুজ্জামান নলিতাবাড়ী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন, মামলায় বদিউজ্জামানকে হত্যার দায়ে ১৮জন অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে কামারুজ্জামানকে প্রধান আসামী করা হয়।
২. একই শেরপুর এলাকায়, জনৈক শাহজাহান তালুকদার বলেন, আল-বদর বাহিনীর সন্ত্রাসীরা ১৯৭১ সালের ২৪শে আগষ্ট প্রকাশ্য দিবালোকে তার চাচাত ভাই গোলাম মোস্তফাকে অপহরণ করে। মোস্তফাকে এরপর স্থানীয় আল-বদর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, ক্যাম্পটি শেরপুর শহরের সুরেন্দ্র মোহন রোডের একটি বাড়ীতে স্থাপন করা হয়েছিল। ক্যাম্পে মোস্তফাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করার পর আল-বদর বাহিনী তাকে নিকটবর্তী শেরী সেতুতে নিয়ে যায় এবং গুলি করে হত্যা করে। কামারুজ্জামান এই হত্যাকান্ডের নির্দেশ দিয়েছিল বলে জানা যায়। শেরপুরের আরো অনেকেই নিশ্চিত করে যে কামারুজ্জামানের সরাসরি নির্দেশে গোলাম মোস্তফা হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছিল।
৩. স্থানীয় প্রাক্তন ছাত্রনেতা তাপস সাহা শেরপুরে আল-বদর ক্যাম্পে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন। তিনি বলেন, এলাকার নারী, পুরুষ এবং যুবকদের ক্যাম্পে জোর করে ধরে নেয়া হতো যেখানে কামারুজ্জামানের সরাসরি তত্বাবধানে আল-বদরের সন্ত্রাসীরা বিভীষিকাময় নির্যাতন চালাতো। যেমন, তৎকালীন শহর পরিষদের একজন নির্বাচিত কার্যালয়-বাহক মজিদকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সারাদিন একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন গর্তের ভেতরে ফেলে রাখা হয়।
.......................(চলবে)
সূত্র
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-১৩)
আবদুল কাদের মোল্লাঃ
১৯৭১ সালে মিরপুর এলাকার মানুষদের কাছে আবদুল কাদের মোল্লা একজন কসাই হিসেবে পরিচিত ছিল। সে সময় মিরপুরে ভারত থেকে আগত বিহারী মুসলমানদের আধিক্য ছিল, এই বিহারীরা বাংলাদেশে পাকিস্তানী দখলদারিত্বের অতি উৎসাহী সমর্থক ছিল।
পাকিস্তানী বাহিনী ও তার সহযোগীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত মানুষদের অন্যতম বৃহৎ গণকবর স্বধীনতার পর মিরপুরের শিয়ালবাড়ী এলাকায় আবিষ্কৃত হয়। মিরপুর এলাকার স্থানীয়দের মতে, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মিরপুর এলাকার শিয়ালবাড়ী এবং রূপনগরে হাজার হাজার বাঙ্গালী হত্যায় কাদের মোল্লা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। তাদের অনেকেই নিশ্চিত করেছিল যে, সেনাবাহিনী তাদের কর্মকান্ড শুরু করার আগেই কাদের মোল্লা তার হত্যার আনন্দ শুরু করে।
৬ই মার্চ মিরপুর ৬নং সেক্টরের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি'র গেট এর সামনে বাঙ্গালী মানুষদের দাবী পেশ করার জন্য একটি জনসমাবেশ আয়োজন করা হয়। যখনই মানুষ জাতীয় স্লোগান জয় বাংলা ধ্বনি দেয়া শুরু করল, সভায় উপস্থিত মোঃ শহিদুর রহমান, কাদের মোল্লা এবং তার বাহিনী তলোয়ার এবং অন্যান্য ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে সভায় আক্রমণ করে।
মিরপুর ১নং সেক্টরের বি-ব্লক নিবাসী মোঃ ফিরোজ আলীর মতে, কাদের মোল্লা ফিরোজ আলীর ভাই ১৮ বছরের ছাত্র পল্লব টুনটুনি হত্যার সাথে জড়িত ছিল। কিশোর টুনটুনি জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সক্রিয় সমর্থক ছিল এবং সে কারণে তার নাম কাদের মোল্লার হত্যা তালিকায় যোগ হয়। ২৯শে মার্চ মোল্লার ঘাতক দল শহরের অন্য প্রান্ত থেকে টুনটুনিকে অপহরণ করে এবং তাক মিরপুরে নিয়ে আসে। এরপর ছেলেটিকে হাত পেছন থেকে বাঁধা অবস্থায় টেনে-হিঁচড়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে আসা হয় এবং আবার ফেরত নেয়া হয়। ধর্মীয় সমাবেশে ব্যবহৃত একটি বড় খেলার মাঠে তাকে গাছের সাথে বেঁধে দুইদিন ফেলে রাখা হয়। পরে মোল্লার লোকেরা ফিরে আসে এবং ছেলেটির আঙ্গুল কেটে ফেলে। ৫ই এপ্রিল অপহরণের এক সপ্তাহ পরে মোল্লা টুনটুনিকে গুলি করে হত্যা করার জন্য তার লোকদেরকে নির্দেশ দেয়। ফিরোজ আলী বলেন, গণকবরে আরো ৭টি লাশের সাথে নিক্ষেপ করার আগে এলাকার অন্যদের জন্য সতর্কতার নিদর্শন হিসেবে ছেলেটির লাশ সেই গাছের সাথে দুইদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়।
মোঃ শহীদুর রহমান চৌধুরী ছিলেন ১৯৭১ সালে কাদের মোল্লার অপরাধ কার্যক্রমের আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি বলেন, অক্টোবরে রাজাকারবাহিনী কাদের মোল্লার নির্দেশে মিরপুর ৬নং সেক্টরে মহিলা কবি মেহেরুন্নেসাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তিনি বলেন, সিরাজ নামের এক ব্যক্তি, যিনি কবির ঘরে থাকতেন, তিনি হত্যাকান্ডের এই দৃশ্য দেখে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। জনাব চৌধুরী আরো বলেন যে, সিরাজ এখনও মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছে।
মিরপুর এলাকার অধিবাসীদের আরো অভিযোগ আছে যে, কাদের মোল্লা মিরপুরের মনিপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়ার অবাঙ্গালী লোকদেরকে তার আদেশাধীন সশ্রস্ত বাহিনীতে সংগঠিত করে। ঐসব বিহারী সশ্রস্ত বাহিনীর সাহায্যে কাদের মোল্লা মিরপুরের বিভিন্ন বধ্যভূমিতে হাজার হাজার বাঙ্গালী হত্যাকান্ড সংঘটিত করত।
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-১২)
২৫শে নভেম্বর একটি বিবৃতিতে আব্বাস আলী খান বলল, “ আমার কোন সন্দেহ নেই যে ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানকে হজম করার ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে মুক্তিবাহিনীর ছত্রছায়ায় একটি নির্লজ্জ উন্মত্ততা শুরু করেছে।আমাদের সশ্রস্ত বাহিনী একা এই যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবেনা। আমাদের সৈন্যদের হাত শক্ত করা এবং আমাদের প্রিয় পাকিস্তানের সন্মান রক্ষায় সাহায্য করা প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য।” একই বিবৃতিতে বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবি ও মুক্তিযোদ্ধাদের তীর্যক উদাহরণ তুলে ধরে সে জনগণকে “দেশবিরোধী ও ধ্বংসাত্বক কর্মকান্ডে লিপ্ত লোকদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকা, এসব বস্তুকে নিশ্চিহ্ন করতে সশ্রস্ত বাহিনী ও শান্তিবাহিনীকে সাহায্য্ করা”-র আহবান জানায়।
বুদ্ধিজীবি হত্যার চারদিন আগে ১০ই ডিসেম্বর সে আরেকটি বিবৃতিতে বলল, “বদরের যুদ্ধে ৩১৩জন মুসলমান এক হাজারেরও অধিক কুরাইশদের মুখোমুখি হয়েছিল এবং বিজয়ী হয়েছিল। আজ ১৩ কোটি জনগণ (তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সন্মিলিত জনসংখ্যা) এই পবিত্র ভূমিকে রক্ষার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। আমাদের শত্রুরা হচ্ছে তারা, যারা ভারত এবং সেই কাল্পনিক দেশ বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তোমাদের এসব শত্রু থেকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রথম সুযোগেই তাদের বিষদাঁত ভেঙ্গে দাও। আমাদের রাজাকার, আল-বদর এবং আল-শামস বাহিনীর সাথে হাত মেলাও এবং দেশরক্ষার কাজে নিজেকে উৎসর্গ কর।”
গভর্ণর মালেক পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আক্রমণকে সুসংহত করার জন্য ডিসেম্বর মাসে বেশ কিছু উপ-কমিটি গঠন করে। খান এ এস এম সোলায়মানের সাথে তথ্য উপকমিটির দায়িত্ব নেয়। ১৯৭১ সালের পরও খান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা অব্যাহত রাখে। ১৯৮০ সালে, ’৭১ পরবর্তী প্রথম সংবাদ সন্মেলনে বক্তৃতা করার সময় সে এবং তার দলের কৃতকর্মের জন্য খান কোন অনুশোচনা করেনি। এর পরিবর্তে সে বলল, “১৯৭১ সালে আমরা সঠিক কাজ করেছিলাম।” এমনকি আজও আব্বাস আলী খান বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এবং মানুষের বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পাকিস্তানে পরিণত করার জন্য তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-১১)
আব্বাস আলী খানঃ

আব্বাস আলী খান ছিল জামায়াতের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি। গোলাম আযমকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমীর ঘোষণার আগ পর্যন্ত আব্বাস আলী খান পার্টি প্রধানের দায়িত্বে ছিল। খান এর ভূমিকা ছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনার বিরুদ্ধে। ১৯৭১ সালে সে পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর উপ-প্রধান ছিল। জামায়াত ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সমমনা দলগুলোর মাধ্যমে গঠিত রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্ এর মত বেসামরিক শক্তিকে সে নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই তিন বাহিনী গঠন করার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে সাহায্য করা, স্থানীয় প্রতিবাদী দলগুলো সম্বন্ধে গোপন তথ্য সংগ্রহ করা, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উপকরণসমূহ খুঁজে বের করা ও তা নিশ্চিহ্ন করা এবং গ্রামগুলোতে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটসহ আক্রমণ করা। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের গণহত্যা অভিযানে এসব বেসামরিক বাহিনীর সরাসরি সহযোগিতা উপভোগ করেছিল যেটি বাংলাদেশের ৩০ লক্ষ নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল। আব্বাস আলী খান অগণিত মিছিলে বক্তৃতা, সংবাদপত্রে বিবৃতি ও প্রবন্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যায় উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়েছিল। বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অভিযানকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করার জন্য গঠিত কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটিতেও খান একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। জামায়াত এবং ক্যাম্প সহযোগিদের নিয়ে গঠিত শান্তি কমিটি তাদের শাখা সারা দেশে বিস্তৃত করেছিল। এই কমিটিগুলো তিনটি বেসামরিক শক্তির রাজনৈতিক শাখা হিসেবে কাজ করতো এবং ১৯৭১ সালে বাঙ্গালীদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে স্তব্ধ করার জন্য পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্দয় প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টের সূত্রানুসারে, ১৯৭১ সালে ক্রমাগত কিছু সাজানো সংসদীয় উপনির্বাচনে অংশে নেয়ার পর গভর্নর এম এ মালেকের মন্ত্রীসভায় খান মন্ত্রী হয়েছিল। উপনির্বাচনের জন্য নির্ধারিত আসনগুলো আওয়ামী লীগের সদস্যদের কর্তৃত্বে ছিল। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পর পাকিস্তানী সামরিক জান্তা আসনগুলো শূণ্য ঘোষণা করে। ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর মালেকের পুতুল সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে খান কাজ শুরু করে।
..................................(চলবে)
সূত্র
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-১০)
সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী(সাকাচৌ) (শেষ অংশঃ)

নুতন চন্দ্র সিংহ হত্যা মামলার শুনানি ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত হয়। নুতন চন্দ্র সিংহের পুত্র সত্য রঞ্জন সিংহ সহ মোট ১২জন এই মামলার সাক্ষী ছিল।এই মামলার ক্রমিক নাম্বার হচ্ছে বাংলাদেশ দন্ডবিধির অধীনে U/S302/120(13)/298 । ১৯৭২ সালের ২৯শে জানুয়ারী মামলার শুনানী শুরু হয়। সাকা চৌধুরী এবং অন্য পাঁচ আসামী পলাতক ছিল। অন্যদিকে তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীসহ বাকী আসামীরা হাজতে ছিল। মামলার চার্জশীটে উল্লেখ ছিল যে, সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী ও অন্যান্য আসামীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত সত্য।
চট্টগ্রামের আরেকজন শহীদের সন্তান শেখ মুহাম্মাদ জাহাঙ্গীর জনগণের তদন্ত কমিশনে জানায় যে, ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাকা চৌধুরী এবং তার সহযোগীরা তার বাবা শহীদ শেখ মোজাফফর আহমেদ এবং তার ভাই শহীদ শেখ আলমগীরকে হাটহাজারীর একটি সড়ক থেকে তুলে নেয় এবং নিকটবর্তী পাকিস্তানী সেনাক্যাম্পে নিয়ে যায়। এবং পরবর্তীতে তাঁদেরকে ঐ ক্যাম্পে হত্যা করা হয়।
স্বাধীনতার পর অভিযোগকারী শেখ মুহাম্মাদ জাহাঙ্গীর সাকা চৌধুরী এবং তার দোসরদের বিরুদ্ধে মামলাও করে। হারুনুর রশীদ খান চট্টগ্রামে জাতীয় পার্টির নেতা । ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে মুক্তিসেনাদের একজন জনসংযোগ কর্মকর্তা(১ নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম তাঁকে ঐ পদে নিয়োগ দেন)ছিলেন। হারুনুর রশীদ তাঁর দায়িত্বের অংশ হিসেবে একটি প্রচারণা সেল গঠন করেন এবং সংবাদদাতাদের সাহায্যে তিনি সালাউদ্দীন ও তার হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট ও অন্যান্য কর্মকান্ডের তথ্য সংগ্রহ করেন। তথ্যগুলো একত্রিত করে তিনি ১ নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম ও যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের কাছে রিপোর্ট পেশ করতেন। এই কাজ করার সময় তিনি জানতে পারেন সাকা, তার বাবা ফকা এবং তাদের বিশ্বস্ত বাহিনীরা কিভাবে শত শত মুক্তিযো্দ্ধা ও বাংলাদেশকে সমর্থনকারী লোকদের তুলে আনতো এবং তাদের গুড’স হিল এর বাসায় এনে নির্যাতন করে হত্যা করতো।
সাকা/ফকা বাহিনী মহিলাদেরকেও ধরে আনতো এবং সেনাবাহিনীর সদস্যদের দৈহিক প্রশান্তি লাভের জন্য তাদের কাছে হস্তান্তর করতো। স্বাধীনতার ঠিক পূর্বে সাকা চৌধুরী দেশ থেকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ধাওয়া করার সময় সে অল্পের জন্য হাত ফসকে যায়। যাই হোক, এটা বিশ্বাস করা হতো যে তাকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া গুলির একটি তার পায়ে বিদ্ধ হয়েছিল। বাংলাদেশে ফিরে এসে, স্বাধীনতার ৩২ বছর পরেও সাকা চৌধুরী এখনও চট্টগ্রাম জেলার বিশেষ করে রাউজানে সম্পদ জব্দকরণ, লুন্ঠন,সন্ত্রাস এবং হত্যার সাথে জড়িত। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত রিপোর্ট এই সংবাদের সত্যতা দেয়।
বর্তমানে সাকা চৌধুরীর ঘাড়ে চট্টগ্রামে তিনটি মামলা ঝুলে আছেঃ ’৯০ এর দশকের শুরুতে তার কিউসি শিপিং হাউসের স্বর্ণ চোরাচালানের ব্যাপারটি চট্টগ্রাম কাস্টমের কাছে জ্ঞাত ছিল, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর সন্ত্রাস কায়েম করা ও তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তার সাহায্য সংস্থা অস্ত্র চোরাচালানে সম্পৃক্ত ছিল বলে বিশ্বাস করা হয়, সংসদ নির্বাচনের সময় ভোট ডাকাতি করা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল বিশেষ করে সামাজিক গণতান্ত্রিক নেতা এবং বামদলগুলোর নেতা ও সমর্থকদের হত্যা করা।
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-৯)
সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী (সাকাচৌ) (পরবর্তী অংশঃ)

বইটিতে আরেকটি ঘটনার বর্ণনা আছে, “১৩ই এপ্রিল অধ্যক্ষ নতুন চন্দ্র সিংহকে হত্যা করা হয়। গহিরা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাদে স্থাপিত মেশিনগান থেকে পাকিস্তানী সেনারা চতুর্দিকে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। প্রচুর গুলি কুন্ডেশ্বরী ভবনে আঘাত করে। এর আগে শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ উদ্ভূত পরিস্থিতি রোধ করার জন্য ভবনটির বাসিন্দাদের সরিয়ে দেন। কিন্তু তিনি নিজে কুন্ডেশ্বরী ভবনের মন্দির আঁকড়ে ধরে সেখানে থেকে যান। সৈন্যদের তাঁর সাথে দেখা করতে আসার প্রত্যাশা করে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তিনি চত্বরে টেবিল-চেয়ার বিছিয়ে রাখেন। দুইটি জীপে করে সৈন্যরা এসেছিল। তার একটি জীপে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তান সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী আরোহণ করছিল। তাদের পেছনে চারটি ট্যাংক কুন্ডেশ্বরী রোডে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত ছিল। অধ্যক্ষ সেনাসদস্যদের অভ্যর্থনা জানালেন এবং তাদের আপ্যায়ন করলেন। তিনি তাদেরকে তাঁর কল্যাণমূলক কাজের বর্ননা দিলেন এবং সেগুলো চালিয়ে নেয়ার ব্যাপারে তাঁর ইচ্ছার কথা জানালেন। এতে সন্তুষ্ট হয়ে সৈন্যরা চলে গেল। কিন্তু সালাউদ্দীন তাদেরকে পুনরায় ফেরত আনলো, কারণ তার বাবা তাকে এই নাস্তিককে জীবিত ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছিল। ক্ষমতাবান একদল বীর সৈন্যের জন্য এই দিনটি স্মরণীয় নয়, বরং ৭০ বছর বয়স্ক একজন নিরস্ত্র বৃদ্ধ যিনি তার লোকদের শান্তি ও ভালোবাসার পক্ষে সংগ্রাম করেছিলেন, তার জন্য স্মরণীয়। তিনি মন্দিরের সামনে মৃত্যুকে বরণ করার জন্য দাড়িয়ে পড়লেন। তারা তিনবার তাঁর দিকে গুলিবর্ষণ করল। একটি গুলি ঠিক তার একটি চোখের নিচে বিদ্ধ হয়। আরেকটি গুলি তাঁর হাতে লাগে এবং তৃতীয় গুলিটি তাঁর বুকে বিদ্ধ হয়। মায়ের জন্য ক্রন্দনরত অবস্থায় তিনি মাটিতে পড়ে যান। তাঁর জন্য হিন্দু, মুসলমান সকলেই শোকার্ত হয়ে গিয়েছিল। শোকার্ত মুসলমানদেরকে সালাউদ্দীন বিদ্রুপাত্নক সুরে বলল, “ কেন তোমরা কষ্ট পাচ্ছ? এটা তো শুধুমাত্র একজন মালাউন মারা গেছে!” ”
১৩ই এপ্রিল দিনটি আরেকটি করুণ মৃত্যুর জন্য স্মরণীয় থাকবে। সালাউদ্দীনের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত গহিরার একজন বিশিষ্ট অধিবাসী চিত্তরঞ্জন বিশ্বাসের ঘরে সকাল সাড়ে দশটায় প্রবেশ করে, বিশ্বাসের পুত্র ছাত্রনেতা দয়াল হরি বিশ্বাসকে তুলে আনে এবং তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
১৯৯১ সালের ২৫শে এপ্রিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ্ আল হারুন সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং তার দুষ্কর্মের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে একটি নির্বাচন সংক্রান্ত মামলা দায়ের করেন। সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী ছিল মামলাটির সাতজন বিবাদীর মধ্যে সর্বপ্রথম। সালাউদ্দীনের দুষ্কর্ম উল্লেখ করে আবদুল্লাহ্ আল হারুন বলেন, সর্বপ্রথম বিবাদী বলপ্রয়োগ করা, নির্মমতা এবং সন্ত্রাসে বিশ্বাসী। সে কখনো আইনের তোয়াক্কা করেনা। নির্বাচনের আইন-কানুনের প্রতি তার কখনো শ্রদ্ধা ছিলনা। জনগণের অধিকারেও সে বিশ্বাস করতোনা। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পাকিস্তানী শক্তিকে সমর্থনের সময় প্রথম বিবাদী স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে অমার্জনীয় এবং জঘন্য ভূমিকা পালন করেছিল। বহু লুটপাট ও হত্যাকান্ডের সাথে সে জড়িত ছিল। ১৯৭২ সালের ১৩ই এপ্রিল চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় তার বিরুদ্ধে দালাল আইনে মামলা করা হয়,মামলার ক্রমিক নাম্বার ছিল ১৭। সমাজসেবক নুতন চন্দ্র সিংহকে হত্যার অভিযোগে রাউজান থানায় বিবাদীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, মামলাটির ক্রমিক নম্বর ছিল ৪১(১)৭২ এবং ৪৩(১)৭২। তার পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছিল যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এক নাম্বার বিবাদী জীবন রক্ষা করার জন্য দেশ থেকে পালিয়ে যায়। তার স্বভাবগত কৌশল এবং সমর্থনে এই বিবাদী সামরিক শাসক এরশাদের মন্ত্রীসভার সদস্য পর্যন্ত হয়েছিল।
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (পর্ব-৮)
সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী (সাকাচৌ)

সাকা চৌধুরী নামে ব্যাপক পরিচিত সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানাধীন গহিরা গ্রামনিবাসী মৃত ফজলুল কাদের চৌধুরী (ফকা চৌধুরী)-র পুত্র। সংসদ সদস্য এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সালাউদ্দীন ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক কর্মকান্ডের মূল হোতা।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে সাকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রচারণায় নেতৃত্ব দেয় এবং পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করে। তার সকল ঘৃণ্য অপকর্মের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তার নিজ শহর চট্টগ্রাম। সুযোগ্য পিতা ফকা চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে এবং ভাই গিয়াসউদ্দীন কাদের চৌধুরী(একজন সাবেক সংসদ সদস্য এবং ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু জনগণের উপর ক্রমাগত অত্যাচার ও সমাজবিরোধী কর্মকান্ডের জন্য ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে রাউজান থেকে জনগণের রায় পেতে ব্যর্থ) এবং অন্যান্য আরও সহযোগিদের সাথে চট্টগ্রামে তার নিজ আবাসস্থল গুড’স হিল থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ বিরোধী নানারকম কর্মকান্ড পরিচালনা করে।
১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারী প্রকাশিত দৈনিক বাংলায় একটি রিপোর্টে সাকা চৌধুরীর যুদ্ধবিরোধী কর্মকান্ড প্রকাশিত হয়, “সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী শত শত যুবকদের ধরে এনে চট্টগ্রামে তাদের গুড হিল বাংলো-তে নিয়ে আসতো এবং তাদেরকে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করতো। সেইসব হতভাগ্য লোকদের মধ্যে ছিলেন শহীদ ডাঃ সানাউল্লাহ্র পুত্র। ১৯৭১ সালের ১৭ই জুলাই সাকাচৌ ছাত্রনেতা ফারুককে ধরে আনে এবং পাকিস্তানী সেনাদের সাহায্যে তাকে হত্যা করে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে আত্মসমর্পনের দিন পর্যন্ত পাকিস্তানী সৈন্যদের একটি দল তার বাংলো পাহারা দেয়ার জন্য নিয়োজিত ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা ফজলুল কাদের চৌধুরীকে তার পরিবারের সদস্যসহ চট্টগ্রাম থেকে ১২০ পাউন্ড লুটকৃত স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় আটক করে। ”
মাহবুব আল আনোয়ার তাঁর রচিত The history of Bangalee’s war of liberation বই-এর ৬৯নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ১৮ই নভেম্বর চট্টগ্রাম কারাগার থেকে নিজামুদ্দীনকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং তিনি উল্লেখ করেন… “৫ই জুলাই আমাকে ধরে নেয়া হয়। তারপর আমাকে ফজলুল কাদের চৌধুরীর কাছে নেয়া হয়। সেখানে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাউদ্দীন তাদের অন্যান্য সঙ্গী খোকা, খলিল এবং ইউসুফ মিলে পেছন দিক থেকে আমার হাত বেঁধে ফেলে এবং মোটা লাঠি এবং বাঁশ দিয়ে আমাকে মারতে শুরু করে। পাঁচ ঘন্টা আমি জ্ঞান না হারানো পর্যন্ত তারা এই কাজ চালাতে থাকে। ৬ই জুলাই রাত ১১টার সময় তারা আমাকে মাঠে ফেলে রেখে যায়। তখন পর্যন্ত আমাকে খাওয়ার জন্য কিছু দেয়া হয়নি, পান করার জন্য এক ফোঁটা পানিও দেয়া হয়নি। যখনি আমি পানি চেয়েছি তারা জবাব দিয়েছে, “তুমি হিন্দুতে রূপান্তরিত হয়েছ, তোমাকে এমনকি পানিও দেয়া যাবেনা।” ১৩ই জুলাই আমাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এই সময়কালে তারা আমার পা ঝুলিয়ে আমাকে নিয়মিত মারধর করতো। সারা দিনের জন্য একমাত্র খাবার ছিল দুই টুকরো হাতে বানানো রুটি এবং পানি। তারা যেকোন অজুহাতে আমাকে লাথি মারতো। এই পরিস্থিতিতে একজন মুসলমান হিসেবে আমার নামাজে আমি আল্লাহ্র কাছে স্বান্তনা প্রার্থনা করেছি। আমি নামাজরত অবস্থায়ও তারা আমাকে পেছন থেকে লাথি মারতো আর বলতো, “তুমি হিন্দু হয়ে গেছ, নামাজ তোমার জন্য না।” ”
.............................(চলবে)
সূত্র